Templates by BIGtheme NET
Home / বিদেশ / শান্তিতে নোবেল এবারও প্রশ্নবিদ্ধ

শান্তিতে নোবেল এবারও প্রশ্নবিদ্ধ

মোহাম্মদ বুয়াজিজি (২৬) নামের এক সাধারণ তরুণের আত্মাহুতির ঘটনায় ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল তিউনিসিয়াজুড়ে। স্বৈরশাসক জাইন এল আবিদিন বেন আলীর সরকারের অন্যায়-অবিচারের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিল জনতা। গণ-আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছিল বেন আলীর সরকার। কিন্তু দেশে শান্তি ফেরেনি। উল্টো ইসলামপন্থী আর ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধে গৃহযুদ্ধের মুখে চলে যায় দেশ। ঠিক সেই সময় এগিয়ে এসেছিল নাগরিক সমাজের চার সংগঠনের জোট ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’। তারা বিবদমান দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আয়োজন করে। এতে বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফেরার পথ প্রশস্ত হয়। তার পথ ধরেই দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয়।
আর গৃহযুদ্ধের মুখ থেকে শান্তিপূর্ণ জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার স্বীকৃতি পেল সেই চার সংগঠনের জোট। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকার জন্য এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছে তারা। গতকাল শুক্রবার অসলোতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সভাপতি কাচি কুলমান ফাইভ চলতি বছরের পুরস্কার ঘোষণা করেন।
এ চার সংগঠন হলো- তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়ন (ইউজিটিটি), তিউনিসিয়ান কনফেডারেশন অব ইন্ডাস্ট্রি, ট্রেড অ্যান্ড হ্যান্ডিক্র্যাফটস (ইউটিআইসিএ), তিউনিসিয়ান হিউম্যান রাইটস লিগ (এলটিডিএইচ) ও তিউনিসিয়ান অর্ডার অব লইয়ারস। শ্রমিকদের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের নিয়ে এসব সংগঠন গঠিত।
তবে ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’ শান্তির নোবেল পাওয়ায় অনেকেই বিস্মত হয়েছেন। এ বছর নোবেলের জন্য যারা মনোনয়ন পেয়েছিল তাদের মধ্যে সেভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না এই চতুষ্টয়। তাদের চেয়ে বরং জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি, পোপ ফ্রান্সিস, কঙ্গোর চিকিৎসক ডেনিস মাকোয়েজ ও রাশিয়ার সংবাদপত্র নভোয়া গেজেতা, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জাফরি ও পরমাণু অস্ত্রবিরোধী প্রচারকর্মীদের নাম বেশি উচ্চারিত হয়েছে।
বুয়াজিজির মৃত্যু থেকে সৃষ্ট স্ফুলিঙ্গে তিউনিসিয়ায় শুরু হয়েছিল ‘জেসমিন বিপ্লব’। সেই বিপ্লবের পথ ধরে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শুরু হয়েছিল গণতন্ত্রের দাবিতে গণ-আন্দোলনের ঝড়, যা পরিচিত হয়ে ওঠে ‘আরব বসন্ত’ নামে। এর জের ধরে তিউনিসিয়ার পর মিসর আর লিবিয়াতেও স্বৈরশাসকের পতন দেখে বিশ্ব। সিরিয়া আর ইয়েমেনেও গণ-আন্দোলন শুরু হয়।
তবে মুক্তিকামী মানুষ যে পরিবর্তনের আশায় আরব বসন্তে যোগ দিয়েছিল তাও আজ পর্যন্ত সফল হয়নি। দেশে দেশে স্বৈরশাসকরা বিদায় নিলেও সেই অর্থে শান্তি ফেরেনি। বরং বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস, অরাজকতা ও সামরিক শাসন জেঁকে বসেছে। মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)।
আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিসিয়ায় গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পরও এখনো অস্থিরতা দূর হয়নি। প্রতিষ্ঠিত হয়নি আইনশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও ফেরেনি।  চলতি বছর দুই হামলায় বিদেশি পর্যটকসহ সেখানে নিহত হয়েছে ৬০ জন। আর সিরিয়া ও ইয়েমেনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিশ্ব মোড়লরা ক্ষমতার রাজনীতি করে যাচ্ছেন। এতে আবারও ফিরে এসেছে শীতল যুদ্ধের আবহ।
নোবেল কমিটিও বলছে, আরব বসন্ত হয়েছে- এমন দেশের অনেকগুলো এখনো ভুগছে, তাদের গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের দাবি এখনো থমকে আছে। যদিও নাগরিক সমাজের স্বতঃস্ফূর্ততায় তিউনিসিয়ায় একটি গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান কাচি কুলমান বলেছেন, ‘২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিউনিসিয়াকে একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা রাখে এই চতুষ্টয়। আলাদা সংগঠন হিসেবে নয়, সেই যৌথ প্রচেষ্টার জন্যই এই জোটকে ২০১৫ সালের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।’
কমিটির ভাষ্য মতে, ‘ন্যাশনাল ডায়লগ কোয়ার্টেট তিউনিসিয়ার সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মৌলিক ধারণা নিয়ে তারা মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে কাজ করে। এর ভিত্তিতেই তারা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় এগিয়ে আসে এবং তিউনিসিয়াকে শান্তি ও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নেওয়ার নৈতিক দায়িত্বটি পালন করে।’
নোবেল কমিটি এই পুরস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে গিয়ে বলে, ‘তিউনিসিয়ার উদাহরণ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করতে সক্ষম। এই চতুষ্টয় অরাজকতাপূর্ণ তিউনিসিয়ায় শান্তিপূর্ণ সংলাপের পথ প্রশস্ত করা ছাড়াও মানবাধিকারের জন্য তৈরি করেছে গভীর শ্রদ্ধাবোধ। এ থেকে আশা করা যেতে পারে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোও বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হবে।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়নের প্রধান হুসেইন আব্বাসি বলেন, ‘এটা তিউনিসিয়ার জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বের বিষয়। পাশাপাশি আরব বিশ্বের জন্যও আশার আলো। সংলাপ যে আমাদের সঠিক পথের দিশা দেখায় এটা তারই বার্তা। এই পুরস্কার আমাদের অঞ্চলের জন্য এই বার্তাই নিয়ে এসেছে যে অস্ত্র ফেলে আলোচনার টেবিলে ফিরতে হবে। তবেই অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। গণতান্ত্রিক তিউনিসিয়ার জন্য যাঁরা শহীদ হয়েছেন এ পুরস্কারের মাধ্যমে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হলো। আমাদের দেশ এখনো নানামুখী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের সামনে রয়েছে। তাই পুরস্কারের জন্য এটাই ছিল সঠিক সময়।’
তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট বেজি সিয়াদ এসেবসি ফেসবুকে দেওয়া ভিডিও বার্তায় তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমরা ঐকমত্যের পথ বেছে নিয়েছিলাম। এ পুরস্কার তারই স্বীকৃতি।’
শান্তির নোবেল পাওয়ায় জাতিসংঘও গতকাল তিউনিসিয়ার চতুষ্টয়কে স্বাগত জানিয়েছে। জেনেভায় সংস্থার প্রধান মুখপাত্র আহমাদ ফাওজি বলেন, ‘শান্তি প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের নাগরিক সমাজের সহযোগিতা প্রয়োজন।’
প্রসঙ্গত, তিউনিসিয়ার সিদি বাউজিদ শহরের সড়কে ঘুরে ঘুরে সেই সবজি বিক্রি করত বুয়াজিজি। কিন্তু তাতে বাদ সাধে পুলিশ। ঘুষ চেয়ে অনবরত জ্বালাতে থাকে। ঘুষ দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না বুয়াজিজির। পুলিশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর নিজের গায়েই আগুন ধরিয়ে দেয় সে। ফেসবুক আর টুইটার হয়ে মুহূর্তের মধ্যে সেই খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠে জনতা, রাস্তায় নেমে আসে তারা। সরকারি বাহিনী তাদের ওপর গুলি চালায়। এতে আন্দোলন আরো বেগ পায়। শুরু হয় গণবিক্ষোভ। এর জের ধরে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি পদত্যাগ করে ২২ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক জাইন এল আবিদিন বেন আলী। এরপর ক্ষমতা নেয় ইসলামপন্থী এনাহদা পার্টি। কিন্তু সরকার বদল হলেও দেশে শান্তি আসেনি। এর মধ্যেই বিরোধী দলের দুজন বড় মাপের নেতা খুন হন। এ ঘটনায় বেজে ওঠে গৃহযুদ্ধের অশনিসংকেত। ঠিক সেই সময় ২০১৩ সালে এগিয়ে এসেছিল ‘ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট’। ইসলামপন্থী ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোকে নিয়ে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে তারা। তার জের ধরেই গত বছরের শেষ দিকে তিউনিসিয়ায় বহুদলীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয়। অক্টোবরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর নভেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়। ১৯৫৬ সালের পর এটাই সেখানে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। আর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিউনিসিয়ায় একটি সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, যে সরকার ধর্ম, লিঙ্গ, রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে।
তবে সমালোচকরা বলছেন, যে সমঝোতার স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হলো সেই সমঝোতা অনেক আগেই তার মাহাত্ম্য হারিয়েছে। তিউনিসিয়াবাসীর সামনে এখন চোখ রাঙাচ্ছে চরমপন্থা। যে সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য মানুষ ঘর ছেড়ে রাস্তায় নেমেছিল তা আজ সুদূর পরাহত। ইসলামপন্থীদের হয়ে লড়াই করতে তিন হাজার তিউনিসীয় নাগরিক ইরাক, সিরিয়া ও লেবাননে পাড়ি জমিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন দেশে ফিরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিচ্ছে।
অবশ্য শান্তির নোবেল নিয়ে বিতর্ক এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ২০১০ সালে চীনা মানবাধিকারকর্মী লি চিয়াওবো, ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ২০০৭ সালে আল গোর, ২০০২ সালে জিমি কার্টার, ১৯৯৪ সালে ইয়াসির আরাফাত, শিমন পেরেস ও আইজ্যাক রবিন, ১৯৮৯ সালে দালাই লামাকে পুরস্কার দেওয়ার পর সমালোচনার ঝড় উঠেছিল। ওবামার পুরস্কারের বিষয়ে নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক গেরি লুন্দেস্ট্যাদ চলতি বছর প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা ‘শান্তির সচিব’ বইয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন।
দায়িত্ব নেওয়ার পরে এই প্রথম নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান কাচি কুলমান ফাইভ এই সম্মানজনক দায়িত্ব পালন করলেন। কমিটির অন্যতম সদস্য হলেন নরওয়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থুরবিয়র্ন জাগল্যান্দ। গেরি লুন্দেস্ত্যাদ তাঁর ‘শান্তির সচিব’ বইয়ে থুরবিয়র্নের সমালোচনা করে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘থুরবিয়র্ন কোনো সভা-সেমিনারের আগে এত দুর্বল হোমওয়ার্ক করে যেতেন যে তাঁর কথাবার্তায় বিব্রত হতে হতো। নিজে না লিখে তিনি অন্যকে দিয়ে নিজের বক্তৃতা লিখিয়ে নিতেন।’
আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে এবারের পুরস্কার বিজয়ী চতুষ্টয়ের প্রতিনিধির হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। পুরস্কার হিসেবে ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার (প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার ডলার), একটি মানপত্র এবং একটি স্বর্ণপদক দেওয়া হবে। এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নে ২০৫ ব্যক্তি ও ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছিল।
প্রসঙ্গত, তালেবান হামলায় বেঁচে যাওয়া পাকিস্তানি কিশোরী মালালা ইউসুফজাই এবং ভারতের শিশু অধিকারকর্মী কৈলাস সত্যার্থী গত বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন।
আগামী সোমবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টায় স্টকহোম অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারের বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে।

About admin

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful