Templates by BIGtheme NET
Home / জাতীয় / প্রেষণের পেরেশানি

প্রেষণের পেরেশানি

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডাব্লিউটিও সেল ও বস্ত্র সেলের কর্মকর্তারা একই ফ্লোরে পাশাপাশি কক্ষে বসেন। দুই সেলের কর্মকর্তাদের জন্যই সকাল ৯টা-৫টা অফিস। মন্ত্রণালয়ের প্রায় বৈঠকেই একসঙ্গে অংশ নেন উভয় সেলের কর্মকর্তারা। তবু তাঁদের যে কেউ সেল পরিবর্তন করতে পারলেই পেয়ে যান ২০ শতাংশ অতিরিক্ত ভাতা, যা প্রেষণ ভাতা নামে পরিচিত। এই অতিরিক্ত ভাতার জন্য প্রেষণে যেতে সবাই তদবিরে ব্যস্ত থাকেন। এই ভাতা এবার বাতিল করা হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোভনীয় পদ বাগাতে প্রেষণের তদবির কমছে না প্রশাসনে। বিদেশ সফর, উপরি আয়ের হাতছানি কিংবা অপেক্ষাকৃত ছোট পদের কর্মকর্তা হয়েও একটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীর সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার মোহে প্রেষণের জন্য তদবির থামছে না। তবে প্রেষণে নিয়োগ সাধারণত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাই পেয়ে থাকেন। অথচ কোনো প্রতিষ্ঠানে ওপরের দিকে একটি পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হলে নিচের দিকের সাতটি পদে পদোন্নতি আটকে যায়। এমন বঞ্চনার কারণে হতাশা-অসন্তোষ নিয়েই অবসরে যেতে হয় প্রশাসন ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের।

প্রেষণের পেরেশানি

২৮টি ক্যাডারের একটি হচ্ছে খাদ্য ক্যাডার। অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তারা যেসব পথ মাড়িয়ে চাকরিতে যোগ দেন তাঁদেরও একই পথে হাঁটতে হয়েছে। জনপ্রশাসনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮২ সালে চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সচিব হয়েছেন। আর খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা পরিচালক পদেই আটকে আছেন। তাঁদের ওপরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও মহাপরিচালকের পদ থাকলেও সেসব পদে তাঁরা পদোন্নতি পান না। এসব পদে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হয় প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের। অথচ খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিবিড়ভাবে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক খাদ্য পরিস্থিতি তদারকি করেন। ভূ-রাজনীতিসহ খাদ্যসংক্রান্ত নানা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা বাইরে থেকে গিয়ে কাজের ক্ষেত্রে খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ওপরই নির্ভর করেন। কিন্তু প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য খাদ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি জোটে না। এমনকি এসব পরিচালক মেয়াদ শেষে চাকরি থেকে চলে গেলে তাঁদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হলেও পদোন্নতি দেওয়া হয় না।

জানা যায়, ‘রাজনৈতিকভাবে’ প্রভাবশালী ও তদবিরবাজ কর্মকর্তারা প্রেষণে গিয়ে ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় ও শীর্ষ পদগুলো দখল করায় ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ বন্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে ক্ষোভ ও হতাশা থেকে কাজের প্রতি তীব্র অনীহা জন্মাচ্ছে তাঁদের।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদসচিব আলী ইমাম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, গণহারে প্রেষণ ভাতা দেওয়া উচিত নয়। প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া হলে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। তবে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণে নিয়োগ দেওয়া দরকার। মেধাবী কর্মকর্তাদের আকর্ষণ করার জন্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ থাকতে পারে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সরকারে বিভিন্ন ক্যাডারের মোট কর্মকর্তার সংখ্যা ৫৪ হাজার ৬৭৬, যাঁদের মধ্যে এক হাজার ১৯৪ জনই নিজ নিজ ক্ষেত্রের বাইরে ভিন্ন দপ্তরে প্রেষণে নিয়োজিত। প্রেষণে থাকা এক হাজার ১৯৪ জন ভাগ্যবান কর্মকর্তার মধ্যে ১৫ জন সচিব, ১৮১ জন অতিরিক্ত সচিব, ৩৮৪ জন যুগ্ম সচিব, ৪৩৫ জন উপসচিব এবং ১৭৯ জন সহকারী সচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাধারণত অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবরা প্রেষণে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিশেষায়িত মহাপরিচালকের পদ দখল করে আছেন অধিদপ্তরগুলোর।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব থেকে শুরু করে শীর্ষ তিন ধাপে অনুমোদিত ৯টি পদেই রয়েছেন প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তা। চতুর্থ ধাপে উপসচিব মর্যাদার পরিচালকের ২৩টি পদের ২০টি, পঞ্চম ধাপের সিনিয়র সহকারী সচিব মর্যাদার সিনিয়র কমিটি অফিসার ও উপপরিচালকের ৪০টি পদের ২০টিও প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের দখলে রয়েছে। সচিবালয়ের বিভিন্ন শাখা ও অধিশাখার এবং সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের একান্ত সচিবসহ ১৪৭টি পদের মধ্যে মাত্র ৯৪টি পদে লোকবল আছে। ওই ৯৪ পদের মধ্যে প্রেষণে ৪৫ জন, অধিকৃত ১১ জন এবং স্থায়ী পদে ৩৮ জন কর্মরত।

সংবিধানের নির্দেশনা অনুযায়ী ১৯৯৪ সালে জাতীয় সংসদ সচিবালয় আইন প্রণয়ন করা হয়, যেখানে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের (বিপিএসসি) মাধ্যমে জনবল নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। গত ২১ বছরে সেই আইন বাস্তবায়িত হয়নি প্রেষণের মওকা বহাল রাখার স্বার্থে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের পদগুলোর প্রতি লোভ বেশি হওয়ার বড় কারণ, সেখানে প্রেষণে যাওয়া কর্মকর্তারা স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ, হুইপসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। ফলে রাজনৈতিক দাপট ও তদবির করে দুই হাতে টাকা উপার্জনের সুযোগ থাকে। সেই সঙ্গে থাকে ঘন ঘন বিদেশ সফরের সুযোগও। ফলে এসব পদ বাগাতে চলে নিয়মিত জোর তদবির। একবার বসতে পারলে আর যাতে সরতে না হয় সে জন্য অফিশিয়াল দায়িত্ব পালনের চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বেশি ব্যস্ত থাকেন দলীয় প্রভাব খাটানো ও নির্বাহী বিভাগকে সন্তুষ্ট রাখার কাজেই।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংসদ সচিবালয়ে সাংগঠনিক ও প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেখানে প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তার সংখ্যাই বেশি। ফলে সংসদীয় কাজে তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কম। আর স্থায়ী জনবল না হওয়ায় তাঁদের কাজের আগ্রহও কম। ফলে সংসদীয় কমিটিগুলো প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে কমিয়ে তা বন্ধ করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, অনেক সময় নিয়োগপ্রক্রিয়া এড়াতে ও দ্রুত শূন্যপদ পূরণ করতে প্রেষণে কর্মকর্তাদের আনতে হয়। এখন তা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে দীর্ঘদিন সংসদ সচিবালয়ে শৃঙ্খলা ছিল না। কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বন্ধ ছিল। পিএসসির মাধ্যমে নিজস্ব জনবল নিয়োগ শুরু হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীন সংসদ সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

জানা যায়, সংসদ সচিবালয়ের মতোই অবস্থা সরকারের অন্যান্য দপ্তর ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিশেষায়িত সেলগুলোর। ওই সব দপ্তর ও সেলের গুরুত্বপূর্ণ বেশির ভাগ পদই প্রেষণে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দখলে।

আগে শুধু লোভনীয় পদগুলো প্রেষণে বাগানোর জন্যই তদবির চলত প্রশাসনে। ২০০৮ সালের ৭ এপ্রিল জারি করা অর্থ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য অতিরিক্ত ২০ শতাংশ হারে প্রেষণ ভাতা চালু করা হয়। তখন থেকে প্রেষণের প্রতি ঝোঁক আরো বাড়ে কর্মকর্তাদের। কোনোমতে দপ্তর বদল করতে পারলেই বাড়তি ২০ শতাংশ অর্থ পাওয়ার মোহে প্রশাসনে পড়ে প্রেষণে নিয়োগের হিড়িক। বিসিএস কর্মকর্তা ছাড়াও সব পর্যায়ের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও প্রেষণে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে যোগ দিতে শুরু করেন, যা এখনো চলছে।

জানা যায়, প্রেষণে নিয়োগের সুবাদে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর, অধিদপ্তর কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মকর্তাদের সই করা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পৌঁছে যাচ্ছে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে জনবল কাঠামো অনুযায়ী নন-ক্যাডার পদে কর্মকর্তা কম হওয়ায় বিভিন্ন ব্যাংকের অফিসার ও সিনিয়র অফিসাররা প্রেষণে কাজ করছেন এ বিভাগে। এই কর্মকর্তাদের সই করা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নির্দেশ পৌঁছে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর এমডিদের কাছে।

একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার মো. মোখলেসুর রহমান প্রেষণে নিয়োজিত আছেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে। গত ২৬ আগস্ট তাঁর সই করা একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রদীপ কুমার দত্তর কাছে। চিঠিতে একটি মামলা পরিচালনাসহ সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এমডিকে। একইভাবে একটি ব্যাংক থেকে প্রেষণে আসা সিনিয়র অফিসার মো. রিপন আলীর সই করা এমন নির্দেশনার চিঠি পাঠানো হয়েছে সাধারণ বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। ব্যাংক থেকে প্রেষণে আসা এক্সিকিউটিভ (সিনিয়র) অফিসার হাছান আল মামুনের সই করা চিঠি দেওয়া হয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে। একইভাবে এক্সিকিউটিভ অফিসার এমরান হোসেনের সই করা চিঠি দেওয়া হয়েছে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা সচিবকে।

About admin

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful