Templates by BIGtheme NET
Home / সম্পাদকীয় / ধর্মের তাৎপর্য অনুধাবনে মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতিচর্চা

ধর্মের তাৎপর্য অনুধাবনে মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতিচর্চা

পাকিস্তান আন্দোলন সূচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভাটার টান লাগে বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনে এবং ধর্মান্ধতা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার দ্রুত প্রসার ঘটতে ঘটতে সেই টান চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির মধ্য দিয়ে।

পাকিস্তানকে বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করার- অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও তার জের টেনে চলতে হচ্ছে আমাদের। সাম্প্রতিককালে এখানে মুক্তমতি ব্লগার হত্যাসহ ধর্মান্ধতা ও ধর্ম সাম্প্রদায়িকতার আশঙ্কাজনক বিস্তৃতি ঘটার হেতু সন্ধানেও পূর্বেকার সেই দিনগুলোর দিকে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে।

সে সময়ে ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, মোফাখ্খারুল ইসলাম প্রমুখ কবি যে ধরনের ইসলামী জোশ প্রচার করে চলছিলেন, সে জোশই ছড়িয়ে পড়তে থাকে এখানকার বহুসংখ্যক নব্য শিক্ষিত তরুণ মুসলমানের মধ্যে। তারা ফররুখের ‘সাত সাগরের মাঝি’র সঙ্গী হয়ে অতীতের ইসলামী দুনিয়ায় মানস সফরে বেরোয়। উদ্দীপনার সঙ্গে তারা পাঠ করে তালিম হোসেনের কবিতা-

পাকিস্তান-

ইসলাম হেথা মুক্তি লভিবে

মুসলিম ফিরে পাবে ঈমান।

হেথা আবাদ হবে গো ফের

অতীতের শান-শওকতের।

হাঁকিছে নকীব-

জাগো হিন্দের লাখো মুসলিম

নওজোয়ান,

দুনিয়ার বুকে ইসলামাবাদ পাকিস্তান।

মোফাখ্খারুল ইসলামের কবিতা থেকে তারা সংগ্রহ করে এমন সব আরবি-ফারসি শব্দ, যেগুলো তাদের বিবেচনায় পাকিস্তানি ইসলামী তমদ্দুনের সঠিক বাহন। বাংলা ভাষাকে হিন্দু প্রভাবমুক্ত করে ‘পূর্ব পাকিস্তানি জবান’ তৈরির উন্মাদনায় মাতোয়ারা হয়ে পড়ে অনেকেই।

বাংলা ভাষার ইতিহাসেরও খোল-নলচে পাল্টে ফেলার প্রয়াস দেখা দেয়। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে নব্য ভারতীয় আর্য ভাষারূপে বাংলা ভাষার উদ্ভব- ভাষাবিজ্ঞানের এই সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ উল্টিয়ে দিয়ে নাজিরুল ইসলাম মোহাম্মদ সুফিয়ান নামের একজন লেখক ‘বাংলা সাহিত্যের নতুন ইতিহাস’ বইটিতে বাংলা ভাষার এক অভিনব ইতিহাস বিবৃত করেন। তিনি প্রমাণ করতে চান, সংস্কৃতসহ কোনো আর্য ভাষার সঙ্গেই বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের কোনো সম্পর্ক নেই, বাংলা ভাষা উৎপন্ন হয়েছে দ্রাবিড়গোষ্ঠীর ভাষা থেকে, সেই দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরবি ভাষার সঙ্গে এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্য মূলত মুসলমানের ভাষা ও সাহিত্য, মুসলমান সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের হাতেই এর বিকাশ ও সমৃদ্ধি।

ধর্মের তাৎপর্য অনুধাবনে মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতিচর্চা

পাকিস্তানি তমদ্দুনপন্থীরা নাজিরুল ইসলামের এই বক্তব্য লুফে নেয় এবং তাদের তমদ্দুনি কর্মকাণ্ডে এর প্রয়োগে কোমর বেঁধে লেগে যায়। একই মনোভঙ্গি থেকে তারা বানান সংস্কারের নামে বাংলা বর্ণমালা সংহারে প্রবৃত্ত হয়; বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বসাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত করেছেন যিনি, সেই কবি সার্বভৌম রবীন্দ্রনাথকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার স্পর্ধা দেখায়; অসাম্প্রদায়িকতার বাণীবাহক বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘মুসলমানীকরণের’ জঘন্য অপপ্রয়াসে মেতে ওঠে।

পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত গোষ্ঠী ও তাদের অন্ধ সমর্থকরাই যেন ইসলামের ধারক-বাহক-রক্ষক হয়ে যায়, তারাই হয়ে ওঠে ইসলাম-ব্যাখ্যার স্বঘোষিত অধিকারী, সেই অধিকারে অন্য কারোর সামান্যতম হস্তক্ষেপও বরদাস্ত করতে তারা রাজি নয়। ইসলামের অন্যতম ব্যাখ্যা দান প্রয়াসী সবাই শাসক শ্রেণির দৃষ্টিতে হয়ে যান ইসলাম ও পাকিস্তানের দুশমন। এই ‘দুশমন’দের দমনই হয় পাকিস্তানের মূল রাষ্ট্রনীতি।

এসব বিষয় সবারই জানা থাকা সত্ত্বেও এগুলো আজ নতুন করে স্মরণ করতে হচ্ছে। অতীতের পটভূমিতেই যে সৃষ্টি হয় বর্তমানের- সে কথা মনে না রাখলেই নয়। তবে সেই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন; অতীত ও বর্তমান- কোনো কালই একমাত্রিক বা একরৈখিক নয়। সব দেশে সব কালেই প্রগতি ও প্রতিক্রিয়ার দ্বন্দ্ব-সংঘাত ঘটেছে, সে রকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মধ্য দিয়ে সমাজ সামনের দিকেই এগিয়ে চলেছে। তেমনটিই ঘটেছে এ দেশে ২৪ বছরের পাকিস্তানি শাসনেও।

১৯৪৮ সালের মার্চেই ‘উর্দু ও একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’- পাকিস্তানের ‘জাতির পিতা’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর এ ঘোষণাই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে আত্মসচেতন হয়ে ওঠার সূচনা ঘটায়। এই আত্মসচেতনতারই সুতীব্র প্রকাশ চার বছর পর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’তে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তুখোড় ছাত্রসহ অগ্রসর চিন্তার কিছু মানুষের উদ্যোগেই বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবির শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। এই মানুষেরাই বাংলা ভাষাকে বিকৃত করার, বাংলা বর্ণমালার বদলে আরবি বা রোমান হরফ প্রবর্তনের কিংবা বাংলা বানান সহজীকরণের নামে নানা ধরনের হাতুড়েপনা প্রতিরোধেও সক্রিয় হয়ে উঠলেন। অনেক বাঘা বাঘা রাজনীতিকই সে সময় নিতান্ত ব্যক্তিস্বার্থে প্রতিক্রিয়াশীলদের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে অনেক গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু এদের বিপরীতে, সংস্কৃতিসেবীদের বৃহদাংশই প্রগতির ঝাণ্ডা বহন করে চলছিলেন। তাঁদেরই উদ্যোগে পাকিস্তানোত্তর কালের প্রথম দশকেই বেশ কয়েকটি সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেগুলো ছিল ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ও ১৯৪৯ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন’, ১৯৫১ সালের মার্চে চট্টগ্রামে ও ১৯৫২ সালের আগস্টে কুমিল্লায় ‘পূর্ব পাকিস্তান সাংস্কৃতিক সম্মেলন’, ১৯৫৪ সালের এপ্রিলে ঢাকায় ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলন’ আর ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘কাগমারী সাংস্কৃতিক সম্মেলন’। এই সম্মেলনগুলো যে পাকিস্তানি তমদ্দুনের ভিতকে নড়বড়ে করে তুলছিল এবং মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথ অনেকখানি বাধামুক্ত করে দিয়েছিল- সে কথা কোনোমতেই অস্বীকার করা যাবে না।

এর কয়েক বছর পর, ১৯৬১ সালে, রবীন্দ্র শতবর্ষ উদ্‌যাপনকে কেন্দ্র করে এখানকার একটি প্রতিক্রিয়াশীল চক্র রবীন্দ্রবিরোধিতায় তৎপর হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকাটি গ্রহণ করে ‘আজাদ’ পত্রিকা। ‘আজাদ’-এ প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে, নানা প্রবন্ধ-নিবন্ধে ও চিঠিপত্রে রবীন্দ্রবিরোধী কুৎসার বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়। ‘আজাদ’কে কেন্দ্র করেই সে সময়কার সব প্রতিক্রিয়াশীল দুর্বুদ্ধিজীবীর একত্র সম্মিলন ঘটেছিল, এদেরই কুৎসিত আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্র শতবর্ষ উদ্‌যাপনকারী বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিসেবীরা।

‘রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মুসলিমবিরোধী, কাজেই মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানে যারা রবীন্দ্র শতবার্ষিকী নিয়ে মেতে উঠেছে, তাদের উদ্দেশ্য এই মুসলিম রাষ্ট্রটিকে ধ্বংস করে হিন্দুশাসিত যুক্তবঙ্গের পথ খোলসা করা’- রবীন্দ্র শতবার্ষিকী উপলক্ষ করে ‘আজাদ’-এ প্রকাশিত এ রকম সব ন্যক্কারজনক বক্তব্যের দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিল ‘ইত্তেফাক’ ও ‘সংবাদ’। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীলদের রবীন্দ্রনিন্দা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিরোধিতাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করে এই দুটি দৈনিক সংবাদপত্র সেদিন যে একান্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা রেখেছিল, সে কথা ভাবীকালের বাঙালিকেও কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে এ কথাও স্মর্তব্য যে ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রবিরোধিতাকে প্রতিহত করতে গিয়েই আমরা রবীন্দ্রসাহিত্যের অন্তরঙ্গ পরিচয় লাভে প্রবৃত্ত হই, রবীন্দ্রসংগীতের মনোযোগী শ্রোতা হয়ে উঠি এবং তখন থেকেই দেশের সর্বত্র রবীন্দ্রচর্চার প্রসার ঘটতে থাকে। এর আগে আমাদের দেশে রবীন্দ্রচর্চা কেবল একাডেমিক পরিমণ্ডলেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৬১ সাল থেকেই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সচেতনতা আমাদের সমগ্র জাতীয় সত্তার অন্তর্গত হয়ে যায়, রবীন্দ্র সচেতনতাই আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নবতর শক্তির সঞ্চার ঘটায়।

সেই শক্তি আমরা প্রত্যক্ষ করি মুক্তবুদ্ধি চর্চায় গতিবেগ সঞ্চারিত হওয়ার মধ্যেও। পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধে আইয়ুবি জঙ্গি শাসনের অন্ধকারের বিস্তৃতি ঘটার সময়টাতেই প্রগতিচেতন বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রয়োজনবোধ অত্যন্ত তীব্র হয়ে ওঠে। সেই প্রয়োজনবোধ থেকেই তাঁরা বিগতকালের ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর ভাবনাধারায় অবগাহনে প্রবৃত্ত হন। এ ব্যাপারে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ সাহিত্য পত্রিকাটির অবদান অবিস্মরণীয়। এই পত্রিকার বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধে প্রকাশিত বক্তব্য মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রটিকে বিশেষভাবে প্রসারিত করতে থাকে। ১৯৬১ সালে ‘রবীন্দ্রশতবার্ষিকী সংখ্যা’রূপে ‘সমকাল’-এর যে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়, তাতে রবীন্দ্রচর্চার সঙ্গে মুক্তবুদ্ধি চর্চার একটি নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটে।

‘সমকাল’ সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরই বিস্মৃতির হাত থেকে উদ্ধার করে আনেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত অন্যতম বিশিষ্ট চিন্তক মোতাহের হোসেন চৌধুরীকে (১৯০৩-১৯৫৬)। সিকান্দার আবু জাফরের উদ্যোগেই ১৯৫৮ সালে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর অসাধারণ কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন ‘সংস্কৃতিকথা’ নামে প্রকাশিত হয়। বলা যেতে পারে, ‘সংস্কৃতিকথা’ পাঠ করেই সে সময়কার অনেক তরুণ ‘পরকালমুখী ধর্মসাধনা নয়, ইহকালমুখী জীবনসাধনা, মানে জীবনের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের প্রয়াস’ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। মোতাহের হোসেন চৌধুরী মনে করেন, সংস্কৃতি সাধনা হচ্ছে ‘নিজের ভেতর একটা ঈশ্বর সৃষ্টি করারই সমার্থক’ এবং প্রকৃত সংস্কৃতিসাধককে ‘নিজের পথটি নিজেই তৈরি করে’ নিয়ে ‘নিজেই নিজের প্রতিনিধি হয়ে’ উঠতে হবে। নিজের ভেতর আল্লাহ সৃষ্টি করা কিংবা নিজেই নিজের নবী হয়ে ওঠার মতো কথা যিনি বলে ফেলেন, অনেকেই তো তাঁকে একজন ‘ধর্মদ্বেষী কালাপাহাড়’ ভেবে বসতে পারেন। তবে তাঁর লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়লে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে মুক্তবুদ্ধি চর্চায় একান্ত নিষ্ঠাবান মোতাহের হোসেন চৌধুরী ধর্মকেও মুক্তবুদ্ধির আলোকেই অবলোকন করেন- অন্ধ ধর্মবিরোধিতাকে প্রশ্রয় দেন না কিংবা এর বিপরীতে মুক্তবুদ্ধিকে ধর্মবুদ্ধির কারাবন্দি করে ফেলেন না। ধর্মের সঙ্গে কালচারের সম্পর্ক বিষয়ে প্রকৃত শিক্ষিত মানুষের প্রত্যয় ও গড়পড়তা সাধারণ মানুষের ধর্মবিষয়ক ভাবনার প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁর সুস্পষ্ট অভিমত-

‘ধর্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত-মার্জিত লোকের ধর্ম। কালচার মানে উন্নততর জীবন সম্পর্কে চেতনা- সৌন্দর্য, আনন্দ ও প্রেম সম্পর্কে অবহিতি। সাধারণ লোকেরা ধর্মের মারফতেই তা পেয়ে থাকে। তাই তাদের ধর্ম থেকে বঞ্চিত করা আর কালচার থেকে বঞ্চিত করা এক কথা।’

স্পষ্ট ভাষায় অভিব্যক্ত এই অভিমতের মধ্যেও আমার একজন বুদ্ধিজীবী বন্ধু ‘একটি সাংস্কৃতিক বর্ণপ্রথার ইঙ্গিত’ খুঁজে পেয়েছেন। অর্থাৎ মোতাহের হোসেন চৌধুরী ‘শিক্ষিত-মার্জিত লোকের’ প্রতি পক্ষপাত দেখিয়ে ‘সাধারণ লোকের’ দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকিয়েছেন- এ রকমই আমার ওই বন্ধুটির মনে হয়েছে এবং এটাকেই তিনি চিহ্নিত করেছেন ‘সাংস্কৃতিক বর্ণপ্রথা’রূপে। না বলে পারা যায় না যে এ রকম মনে হওয়াটা পুরোপুরিই ভ্রান্ত। প্রকৃত প্রস্তাবে ধীমান সংস্কৃতিসাধক মোতাহের হোসেন চৌধুরী সাধারণ মানুষকে অবজ্ঞা বা করুণা করার বদলে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন এবং সেই মানুষরা ধর্মকে আশ্রয় করেই যে যথার্থ ‘কালচার্ড’ জীবন যাপন করে, সেই বিষয়টির প্রতিই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন। ধর্মকে অবজ্ঞা যেমন তিনি করেননি, তেমনই ধর্মের প্রতি অকারণ মোহ পোষণ করা থেকেও দূরে অবস্থান করেছেন। কালচার ও ধর্ম- কোনো বিষয়েই তিনি একদেশদর্শী নন। একজন কালচার্ড মানুষের পক্ষেই যে ধর্মের প্রকৃত তাৎপর্য উদ্ঘাটন করে ধর্মানুসারী সাধারণ মানুষের ভেতরকার কালচারকে শনাক্ত করা সম্ভব এবং এ রকম শনাক্ত করেই যে সাধারণ মানুষকে টেনে তুলে নিয়ে পুরো সমাজে কালচারের বিস্তৃতি ঘটিয়ে ধর্মের প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবহারকে প্রতিরোধ করা যায়- এমনটিই ছিল মোতাহের হোসেন চৌধুরীর ‘সংস্কৃতিকথা’র মূল বক্তব্য। সেই বক্তব্যকে জনগ্রাহ্য করে তোলারই দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল সিকান্দার আবু জাফরের ‘সমকাল’।

‘সংস্কৃতিকথা’য় পরিবেশিত বক্তব্য এবং বিগত শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ‘সমকাল’-এর ভূমিকা সম্পর্কে অবহিত হওয়া একালের তরুণ মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীদের জন্য একান্ত প্রয়োজন বলেই আমি মনে করি। বিশেষ করে সম্প্রতি কয়েকজন ‘ব্লগারের’ নির্মমভাবে নিহত হওয়ার পর ধর্ম সম্পর্কে আলোচনা ও মতামত প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত হওয়ার প্রয়োজন খুবই তীব্র হয়ে উঠেছে। ব্লগারদের সবাই যে ধর্মের আলোচনায় সঠিক পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটিয়েছেন- এ রকম বলা যাচ্ছে না। ধর্মমোহগ্রস্ত ও ধর্মব্যবসায়ীদের কাছে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করা চলবে না, মুক্তবুদ্ধির আলোকে ধর্মের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ অবলোকন করতে হবে অবশ্যই, প্রয়োজনে ধর্মধ্বজী মতলববাজদের বিরুদ্ধে কখনো গেরিলা যুদ্ধে এবং কখনো সম্মুখ যুদ্ধেও নামতে হবে বটে। কিন্তু যথাযথ রণকৌশল অবলম্বন না করে যুদ্ধ করতে গেলে পরাজয়ই হবে অনিবার্য নিয়তি।

এই নিয়তির হাত থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই এ কালেও বিগতকালের ‘সমকাল’-এর কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য তরুণ প্রজন্মের মুক্তবুদ্ধি চর্চাকারীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ‘সমকাল’-এর পাতায় সে সময়কার অনেক প্রগতিচেতন বুদ্ধিজীবীর যেসব সাহসী ও দায়িত্বশীল বক্তব্য উঠে এসেছিল, সেসবই এ কালেরও সংস্কৃতিচর্চাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

About admin

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful