Templates by BIGtheme NET
Home / জাতীয় / ঘর ছাড়তে শিখলেন প্রসূতিরা, ঝুঁকি কমল নবজাতকদের

ঘর ছাড়তে শিখলেন প্রসূতিরা, ঝুঁকি কমল নবজাতকদের

মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টা বয়সের নবজাতককে কোলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন শিউলী বেগম। বাইরে মা ও নবজাতককে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য অপেক্ষায় আছেন স্বজনরা। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে শিউলী বললেন, “ইগু আমার পয়লা হুনা (সন্তান)।” একটু থেমে বলেন, “আমরা দুইজন ভালাই আছি।”

গত রবিবার দুপুরের পর বাউরভাগ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের শিউলীর মতো রুবীনা নামের আরেকজনকে দেখা যায় প্রসবের অপেক্ষায় শুয়ে থাকতে। তাঁর স্বজনরাও রয়েছেন পাশেই। ওই কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা সরকারের পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা মাহমুদা খাতুন জানান, গত ১ নভেম্বর থেকে রবিবার পর্যন্ত এই কেন্দ্রে ৫৪ জন গর্ভবতী নারী আসেন সন্তান প্রসবের জন্য। এই সেন্টারে তাঁদের মধ্যে ৩৯ জনের সন্তান প্রসব হয়, বাকিদের অবস্থা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তাদেরকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। আর এই সেন্টারে যাদের প্রসব হয় তাঁরা সবাই নিজেরাও সুস্থ আছেন, সুস্থ আছে তাদের নবজাতক সন্তানরাও। যদিও একটি শিশুর কিছুটা শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় তাঁকে পাঠানো হয়েছিল জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নবজাতকের বিষেশায়িত ইউনিট বা স্ক্যানুতে।

বেশিরভাগই পাহাড়ি এলাকার সঙ্গে কিছু পানি ভরা হাওর আর কিছু সমতল নিয়ে সীমান্তবর্তী জৈন্তাপুর উপজেলাজুড়ে গর্ভবতী মায়েরা তাঁদের সন্তান প্রসবে ঘর ছাড়তে শুরু করেছেন ২৪ ঘণ্টা নরমাল ডেলিভারির সুবিধাসম্বলিত চারটি বিশেষায়িত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র ও একটি স্ক্যানুর ভরসায়। এর মধ্যে দুটি সেন্টার পুরোটাই সরকারের ব্যবস্থাপনায় চলছে। আর বাকি দুটি ডেলিভারি সেন্টার ও একটি স্ক্যানু চলছে সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে ফ্রেন্ডস ইন ভিলেজ ডেভেলেপমেন্ট বাংলাদেশ’র ব্যবস্থাপনায়। কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি-কোইকার অর্থায়নে সেইভ দ্যা চিলড্রেনের কারিগরি সহায়তায় মমতা প্রকল্পের মাধ্যমে তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের আওতায় এমন আশার আলো দেখেছেন এলাকার গর্ভবতী নারীরা। ফলে এখন এ এলাকার কেউবা পরিবারের বাধা ভাঙতে না পেরে বাড়িতে সন্তান প্রসব করলেও সন্তান জন্মের পর ঠিকই নবজাতককে নিয়ে আসেন স্ক্যানুতে।

রবিবার বিকেলে জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্ক্যানু কক্ষের বাইরে স্থানীয় মসজিদের ইমাম বেলাল হোসেন অপেক্ষা করছিলেন। জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমার পাঁচ দিন বয়সের শিশু সন্তানকে এখানে নিয়ে এসেছি চিকিৎসার জন্য। বাড়িতেই ডেলিভারি হয়েছিল। কিন্তু পরদিন শিশুটির শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়ায় এই স্ক্যানুতে নিয়ে আসি। এখানে আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়ার পর এখন সে সুস্থ। আজ তাকে বাড়ি নিয়ে যাবো।”

স্ক্যানুর দায়িত্বে থাকা চার চিকিৎসকের অন্যতম ডা. মো. আব্দুস সবুর বলেন,  “এখানে বেশিরভাগ নবজাতককে নিয়ে আসা হয় শ্বাসকষ্ট ও কম ওজন নিয়ে জন্মের পর সৃষ্ট নানা জটিলতার কারণে। আমরা এখানে পাঁচটি রেডিয়েন্ট ওয়ার্মার, তিনটি ফটোথেরাপি, ছয় অক্সিজেন ইউনিট, রুম হিটার, ব্রিদ্রিং মনিটর, ইলেক্ট্রিক সাকার, প্যাডেল সাকারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় ওষুধ রয়েছে। যা দিয়ে আমরা এখানে নবজাতকদের জীবন বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। এখানে সম্ভব না হলে বা কোনো সমস্যা মনে করলে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে আলাপ করে প্রয়োজন অনুসারে পাঠিয়ে দিই।

মমতা প্রকল্পের জৈন্তাপুর উপজেলা সমন্বয়কারী রিক্তা দাস বলেন, “আমাদের এখানে ২০১৩ সালের মার্চে স্ক্যানু কার্যক্রম চালু হয়। এ পর্যন্ত মোট ‌এক হাজার ৪২২ জন নবজাতক শিশু জটিল সমস্যা নিয়ে এই কেন্দ্রে সেবা নিতে আসে। এর মধ্যে গত আড়াই বছরে মাত্র ৪৬ শিশুকে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারিনি। এর বাইরে আরও ১২২৯ শিশুকে আমরা আউটডোর সেবা দিয়েছি।

অন্যদিকে বাউরভাগ ও চারিকাটায় দুটি ২৪ ঘণ্টা ডেলিভারি সেন্টারে সেবা নিতে আসেন ৬৮ প্রসূতি নারী। যাঁদের মধ্যে ৫০ জনের নরমাল ডেলিভারি হয় এবং বাকি ১৮ জনকে অন্যত্র পাঠানো হয় জটিলতার কারণে। এ কাজে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে বিনা বেতন ভাতায় নিয়োজিত কমিউিনিটি ভলান্টিয়ার গ্রুপ। গ্রুপের সদস্যরা নিয়মিত প্রসূতিদের সম্পর্কে তথ্য আদানপ্রদান করেন চিকিৎসক ও প্রকল্পের অন্যদের সঙ্গে।

জৈন্তাপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. বশির উদ্দীন কালের কণ্ঠকে বলেন, “আগে এখানে প্রায় সব ডেলিভারিই বাড়িতে হতো। ধর্মীয় কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার মুখে প্রসূত নারীদের হাসপাতালে আসতে দেওয়া হতো না। কিন্তু এখন এই নতুন প্রকল্পের আওতায় এলাকার মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের কর্মীরা প্রসূত নারীদের তালিকা করে নিয়মিত ঘরে ঘরে গিয়ে মনিটরিং করছেন। ফোনে প্রতিদিন খোঁজখবর নিচ্ছেন। সময় মতো তাঁদেরকে ডেলিভারি কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। ফলে বিপত্তি অনেকটাই কমে গেছে।

বাউরভাগ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল জলিল জানান, এলাকার মানুষ যেন এখন অন্ধকার থেকে আলোর নাগাল পেয়েছে। অন্য এলাকা থেকেও এখন মানুষ গর্ভবতী নারীদের নিয়ে এখানে আসছেন। এখানে আগে সরকারি ইউনিয়ন পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রটি প্রায় পরিত্যক্ত ছিল। এখন নতুন প্রকল্পের আওতায় এটা সংস্কার করে এখন মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় সক্রিয় করা হয়েছে। এতে খুশি হয়ে এলাকার মানুষ প্রধান রাস্তা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সড়ক তৈরিতে এগিয়ে এসেছে।

জৈন্তাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. সুবল চন্দ্র বর্মন বলেন, “সরকারের সঙ্গে সেইভ দ্যা চিলড্রেন ও কোইকা একযোগে এই এলাকার মা ও নবজাতক শিশুদের সুরক্ষায় যেভাবে কাজ করছে- তা অন্য এলাকার জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।” তিনি বলেন, “জৈন্তাপুর এলাকার হোম ডেলিভারি অনেকাংশে কমে আসছে। নবজাতক মৃত্যু হারও কমেছে। এ কার্যক্রম আরো দীর্ঘমেয়াদি ও অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া গেলে সরকারের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যাবে।

মমতা প্রকল্পের পরিচালক মো. জামিল আক্তার বলেন, “বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত  উপজেলা পর্যায়ে স্ক্যানু কেবলই একটি। যা সিলেটের জৈন্তাপুরে রয়েছে। এর সফলতা সম্পর্কে সরকার অবহিত। সরকার পরিকল্পনা করেছে দেশের অন্যান্য উপজেলায়ও পর্যায়ক্রমে এ স্ক্যানু চালুর। জৈন্তাপুরে সরকারের স্থাপনায়, সরকারের সহায়তায় আমরা মমতা প্রকল্পের মাধ্যমে এলাকার নবজাতকদের সুরক্ষায় যেমন সচেতনতা ও সক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছি, তেমনি একইভাবে সরকারের সঙ্গে সমন্বিতভাবে ২৪ ঘণ্টা নরমাল ডেলিভারি সার্ভিস শুরু করে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিতকরণে এলাকার মানুষের মাঝে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছি।”

About admin

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful