Templates by BIGtheme NET
Home / সারাদেশ / গোপালগঞ্জের বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা কল্পনা সাহা

গোপালগঞ্জের বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা কল্পনা সাহা

গোপালগঞ্জের সাহসী বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা কল্পনা রানী সাহা মুক্তিযুদ্ধে যেমন সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন ঠিক তেমনিভাবে সকল প্রতিকুলতা অতিক্রম করে জীবন যুদ্ধেও সফল হয়েছেন।

দেশ প্রেম, অবিচল আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় মনোবল ও ঐকাািন্তক ইচ্ছা তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে। সকল সামাজিক বাধা ভেঙ্গে এগিয়ে গেছেন তিনি ক্রমাগত সফলতার শিখরে। সমাজে এখন একজন প্রতিষ্ঠিত নারী তিনি। তার সন্তানেরা এখন সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে সমাসীন।

১৯৭১ সালে ছাত্রজীবনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন কল্পনা রানী সাহা। তিনি বলেন, তবে যে উদ্দেশ্যে তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন, তার কতটুকু পূরণ হয়েছে-তা নিয়ে রয়েছে তার নানা কষ্ট এবং অনুযোগ। তারপরও মুক্তিযুদ্ধ তার একমাত্র গর্ব-অহংকার।

গত ৫ ডিসেম্বর দুপুরের পর গোপালগঞ্জ জেলা শহরের আমেনা ও রেশমা স্কুলের পাশে স্বামীর নিজ বাড়িতে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় কল্পনা রানী সাহার। দীর্ঘ ৪৪ বছর পর হলেও মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনের কথা স্মরণ করে তিনি বললেন তার মনের ভেতরে আটকে থাকা অনেক কথা।

আপনি কেমন আছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে কল্পনা রানী বলেন, জি, মহান আল্লাহু রাব্বুল আলামিন আমাকে খুব ভালো রেখেছে। এবার বলুনতো, আপনি কি স্কুল জীবন থেকে রাজনীতিতে সচেতন ছিলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বললেন, হ্যাঁ দাদা, তখন আমি গোপালগঞ্জ সরকারি বীণাপানি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেনীর ছাত্রী। আমাদের প্রধান শিক্ষকা ছিলেন ফিরোজা ম্যাড়াম। বঙ্গবন্ধুর আহবানে সারাদেশে অসহযোগ আন্দোলন চলছে। অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীরা শহরে মিছিল বের করলে আমরাও স্কুলে বই খাতা রেখে ওই মিছিলে যোগ দিতাম।

আমার কণ্ঠ ছিলো বলিষ্ট ও ভরাট। আমি নিজেই শ্লোগান ধরতাম। আমার কন্ঠে উচ্চারিত জয় বাংলা শ্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠতো রজপথ। সে সময় আমার শ্লোগানের খুব সুনাম করতেন সবাই। এ কথা বলছেন, আর কিভাবে তখন শ্লোগান দিতেন এমন দৃশ্য দেখাতে ডান হাত উচু করে অতীতে ফিরে যান তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ  করতে হবে এমন কোন ভাবনা আপনাকে তখন তাড়া করত কি না? এমন প্রশ্নের উত্তরে কল্পনা বলেন? তাড়া করতো কিনা মানে, তাড়াতো অবস্যই করত। ৭০’র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে রাত-দিন মাঠ-ঘাট চষে বেড়িয়েছি। প্রচার প্রচারণা চালিয়েছি। সেই সকালে কখনও খেয়ে আবার কখনও না খেয়ে বাসা থেকে বেরিয়েছি-আর ফিরেছি রাতে। বিভিন্ন মানুষে বিভিন্ন রকম কথাও বলেছেন মন্তব্যও করেছেন। কিন্ত কান দেইনি।

তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর বিষয়টি আমাদের কাছে আরও পরিষ্কার হলো। তৎকালীন কায়েদা অাজম কলেজের শরীর চর্চার ডেমোনেস্ট্রেটর আবুল হোসেন ভুইয়া আমাদের বীনাপানি স্কুল মাঠে শরীর চর্চা ও ডেমী রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন। আমরা স্বতঃস্ফুর্তভাবে প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কল্পনা রানী বলেন, একসময় ভারতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন বাবা। যে কথা, সেই  কাজ।

কিভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার ইচ্ছায় বাবা আমাকে সঙ্গে করে কোলকাতা থিয়েটার রোডে বাংলাদেশ মিশনে নিয়ে যান। সেখানে তৎকালীন গোপালগঞ্জ মুহাকুমা আওয়ামীলীগের সভাপতি ডাঃ ফরিদ উদ্দিন আহম্মদের সঙ্গে দেখা করেন। ফরিদ কাকা বললেন, মা-রে, ছেলেদের সঙ্গে মেয়েদের ট্রেনিং দিচ্ছে না। তবে তোকে আমি একটা ঠিকানা দিচ্ছি। ওই ঠিকানায় তুই চলে যা। বাবা-মেয়ে পাকসার্কাসের দিকে রওনা দিলাম। সাজেদা চৌধুরী আপার (বর্তমানে সংসদ উপনেতা) সঙ্গে দেখা করলাম।

সাজেদা আপা বললেন শনিবার আসো। এরপর সাজেদা আপার কথা অনুযায়ী ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম। ওইদিন ইন্টারভিউ বোর্ডে আমাকে ডাকা হলো। আমাকে জিজ্ঞাসা  করলেন, তুমি কি এখানে থেকে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে এসেছো ? আমি বললাম হ্যাঁ। তারপর তিনি বললেন, দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত মা বাবার সঙ্গে দেখা হবে না। বাবা মা আছে কিনা? আমি বললাম আছে।

সাজেদা আপা বললেন, এমনও হতে পারে আর কোন দিন ওনাদের সঙ্গে তোমার দেখা হবেনা। এমন হতে পারে ৫-১০ বছর চলতে পারে এ যুদ্ধ। তুমি কি প্রস্তুত? চিন্তা করে দেখ। আমি বললাম, থাকার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে এখানে এসেছি। বাবা চলে আসলেন-আমি থেকে গেলাম। এরপর আরো কয়েকজন মেয়েসহ আমাকে গাড়ীতে করে গোবরা ট্রেনিং সেন্টারে (বাংলাদেশ নার্সিং ক্যাম্প) নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আমাদের প্রশিক্ষণ শুরু হলো।

পরে সাজেদা আপা আমাদের বললেন, তোমরা যুদ্ধ করতে চাও? আমি যে জন্য এসেছি এবং তোমরা যা করবে সেটাও একটা যুদ্ধ। কারণ আমাদের যে সব ভাইরা আহত হয়ে আসবে তাদের দেখার জন্য কেউ থাকবে না। সবাই অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধে গেলে অসুস্থ  হলে দেখবে কে? যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী  হবে বলা যায় না। প্রয়োজনে ভবিষ্যতে তোমরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করবে। এরপর কোলকাতার নীল রতন হাসপাতালে পুরোদমে আমাদের হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু হলো। কিছুদিন পর আমাদের আগরতলা নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমরা আহত ভারতীয় সেনাদের সেবা শুশ্রুষা করি। তারপর বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা হাসপাতালে আমাদের নিয়ে গেল। টিনসেডের অস্থায়ী  হাসপাতালের মেঝেতে কয়েক’ শ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের শোয়া দেখলাম। সে কি ভয়াবহ দৃশ্য, নিজ চোখে না দেখলে কল্পনা করাও কঠিন। কারও হাত, পা, মুখের একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

বোমার স্পিন্টারের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত শরীর-মাথায় গুলি। আমাদের উপর দায়িত্ব পড়লো ওইসব আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্থ করে তোলার। ক্ষতস্থান ওয়াশ করা, ইনজেকশন দেয়া, ব্যান্ডেজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন অপারেশনে ভারতীয় ও বিদেশি ডাক্তারদের সহযোগিতা  করতাম।

দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে এ খবর পাওয়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন ছিল এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আগরতলা যাওয়ার ১৪ দিনের মাথায় হঠাৎ এক রাতে চিৎকার শুনতে পেলাম। দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। সে কি আনন্দ। তাবু থেকে সবাই বেরিয়ে  আসলাম। আনন্দ আত্মহারা হয়ে গিয়েছিলাম। কেঁদে ছিলাম। ২৭ ডিসেম্বর  আমাদের সার্টিফিকেট দেয়ার পর মা-বাবার কাছে চলে আসি।

কল্পনা রানী সাহা গোপালগঞ্জ সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজে বি, এ পড়েছেন। এরপর ১৯৮০ সালে শহরের কাপড় ব্যবসায়ী সুনীল কুমার সাহার সাথে আমার বিয়ে হয়। আমার ১ ছেলে ও ২ মেয়ে। ওদের নিয়ে বেশ ভাল সময় কেটে যাচ্ছে । বড় ছেলে ভাস্কর সাহা ৩০ তম-বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়ে পুলিশ সার্ভিসে চাকরি করছে। বর্তমানে ও যশোরের এএসপি (সার্কেল) । বড় মেয়ে তোড়া সাহা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রত্নতাত্তিক বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করে বর্তমানে রাষ্ট্রয়াত্ত ঔষধ কোম্পানী  ইডিসিএল-এর সিনিয়র অডিট অফিসার হিসেবে কাজ করছে। আর ছোট মেয়ে অমৃতা সাহা ছাত্রী।

তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা  হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান পেয়েছি। আমার স্বামীর মৃত্যুর পর ২০০৯ সাল থেকে কল্যান ভাতা পাচ্ছি। জীবনে এতদূর কিভাবে এলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন,ছোট বেলা থেকেই আমি সংগ্রাম করে আসছি। স্কুল জীবন, মুক্তিযুদ্ধ তারপর সংসার জীবন সব মিলিয়ে একসময় কষ্টই করতে হয়েছে আমাকে। আজ আমার কোন কষ্ট নেই। তবে, পাকহানাদার বাহিনীর লোকজন সেদিন গোপালগঞ্জ বিনাপানী স্কুলের শিক্ষক সুধীর বাবুকে যারা হাতে পেরাক পিটিয়ে একটি তাল গাছের সাথে বেধে নির্মমভাবে হত্যা করেছিলো তাদেরও বিচার চাই।

কল্পনা রানী বলেন, যে যুদ্ধ আমাদেরকে দিয়েছে একটি স্বাধীন ভূ-খন্ড, একটি পতাকা ও একটি চেতনা সেটি আমৃত্যু লালন করে যেতে চাই।

About admin

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful