Templates by BIGtheme NET
Home / রাজনীতি / আমার দিন: ব্র্যাক, অরবিস এবং ফেসবুক কাহিনী

আমার দিন: ব্র্যাক, অরবিস এবং ফেসবুক কাহিনী

এক.

গত সপ্তাহে ‘আমার দিন: ফুল বিক্রি করে স্কুল হয় না’ প্রকাশিত হওয়ার পর লেখাটি নিয়ে বেশ কিছু প্রতিবাদ এসেছে। বিশেষ করে ওই লেখায় ব্র্যাকের প্রসঙ্গ আসাতে অনেকেই ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। এটা লেখক হিসেবে আমার ব্যর্থতা। আমি লেখক হিসেবে আমার চিন্তাটাকে নিশ্চয়ই ততোটা ভালো করে প্রকাশ করতে পারিনি, যা সমাজে কনফিউশন তৈরী করতে পারে। লেখকদের কাজ সমাজে কনফিউশন তৈরী করা নয়, কনফিউশন দূর করা; চিন্তাটাকে সঠিক দিকে প্রবাহিত করা কিংবা কোনো একটি পরিস্থিতির বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বের করা। কোনো লেখকের লেখা যদি সমাজে কনফিউশন তৈরী করে, তাহলে এর চেয়ে ব্যর্থতা আর হতে পারে না। সেই দায়ভার আমি নিচ্ছি।

তবে পাঠকদেরও কি কিছু দায়িত্ব এর ভেতর থেকে যায় না? পাঠক যদি কোনো লেখার ভেতর খুব বেশি প্রবেশ করতে না পারেন, কিংবা খুব সারফেস লেভেলে চিন্তা করেই মন্তব্য প্রকাশ করেন, তাহলে সেই ব্যর্থতা যতটা লেখকের উপর বর্তায়, তার কিছু হয়তো পাঠকের উপরও যায়। একটি সমাজে সেই রকম লেখকই তৈরী হয়, ওখানে তার পাঠক যেমন। পাঠক যদি কোনো লেখা নিতে না পারেন কিংবা লেখাটির মর্মার্থ ধরতে না পারেন, তখন লেখককেও পিছু হটতে হয়। এ কারণেই হয়তো অনেক লেখক তার মৃত্যুর অনেক পরে গিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন। আমি বিশ্বাস করি একজন ভালো লেখক, চিত্রশিল্পী কিংবা দার্শনিক তার জীবদ্দশায় জনপ্রিয় হতে পারেন না; হওয়ার কথাও নয়। তাদের মৃত্যুর অনেক পরে মানুষ সেগুলো নিয়ে এনালাইসিস করবে; তখন হয়তো রেফারেন্সটা বুঝতে পারবে। আমি বলছি না, আমি সেই মাপের লেখক। আমি শুধু বলার চেষ্টা করছি, পাঠকদেরও আরো অগ্রসর হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

দুই.

ব্র্যাক নিয়ে কিছু বলার আগে, অরবিস নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। অরবিসকে মানুষ চেনে একটি ‘উড়ন্ত চক্ষু হাসপাতাল’ হিসেবে। তারা এটাকে বলে থাকেন ‘ফ্লায়িং আই হসপিটাল’। একটি উড়োজাহাজের ভেতর পুরো একটি চক্ষু হাসপাতাল। ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আমেরিকার এই এনজিও-টি বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৯২ টি দেশে কাজ করছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে চোখের চিকিৎসা করাই অরবিসের একমাত্র উদ্দেশ্য নয়। তারা ওই উড়োজাহাজের ভেতর একটি ট্রেনিং সেন্টারও তৈরী করে নিয়েছেন, যেখান চক্ষু পেশার সাথে জড়িত প্রফেশনালদেরকে ট্রেনিং দেওয়া হয়। অরবিসের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, ২০১৩ সালেই তারা ২২ হাজার প্রফেশনালাকে ট্রেনিং দিয়েছে এবং ৫৭ লাখ মানুষকে চোখের চিকিৎসা দিয়েছে।

বাইরে থেকে দেখলে এটা একটা ডিসি-১০ বিমান। কিন্তু ভেতরের সবকিছু বিশেষভাবে তৈরী করা। যতটা মনে পড়ে, স্কুলে পড়ার সময় একবার পত্রিকায় পড়েছিলাম, অরবিসের উড়োজাহাজ বাংলাদেশে নেমেছিল। প্লেনের ভেতর চোখের জটিল অপারেশন হচ্ছে, এটা পড়েই শিহরিত হয়েছিলাম। এখনও মনে আছে, ইত্তেফাকের সেই রিপোর্ট আমার কাছে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর মতো মনে হয়েছিল। বিষয়টা যেন অনেকটা এমন যে, আকাশ থেকে একটি সসার এসে নামল। তারপর আমাদের অসংখ্য অন্ধ মানুষের চোখে আলো দিয়ে তারা চলে গেল। এর থেকে বড় সায়েন্স ফিকশন কী হতে পারে!

বর্তমান সময়ের মানুষকে এভাবে ভাবতে হয় না। তাদের কাছে টিভি আছে, ইন্টারনেট আছে। আমার ছোট বেলায় অরবিস যেভাবে আলোড়ন তৈরী করেছিল, বর্তমান সময়ের শিশু-কিশোরদেরকে তা হয়তো ছুঁয়েই যাবে না। তারা মনে করবে, ‘ওহ এটা আর তেমন কি! এটা তো হতেই পারে।’ সময় পাল্টেছে, জ্ঞানের বিস্তৃতি বেড়েছে, তথ্যের প্রবাহ বেড়েছে।

কিন্তু অরবিসের একটি বিজ্ঞাপনের কথা আমার এক গুণমুগ্ধ পাঠক গতকাল মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। বিজ্ঞাপনটির সঠিক কথাগুলো আমার মনে নেই। তবে বিজ্ঞাপনটির মূল বক্তব্যটি ছিল, অরবিসের ‘ভিশন’ হলো ‘গোয়িং আউট অফ বিজনেস’। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের একটি ভিশন থাকে। তাদের ভিশন হল, এই কার্যক্রমটি বন্ধ করে দেওয়া। এখানে তারা ‘ভিশন’ শব্দটিকে দু’টি অর্থে ব্যবহার করেছেন। একটি হলো ‘লক্ষ্য’, আরেকটি হলো ‘দেখা’ বা দৃষ্টিশক্তি। প্রতিষ্ঠানটি মনে করছে, এই পৃথিবীর সকল মানুষ যখন দেখতে পাবে, তখন আর তাদের প্রয়োজন হবে না। তাই তারা যত বেশি সফল হবেন, তারা ততো তাড়াতাড়ি তাদের কার্যক্রমটি বন্ধ করে দিতে পারবেন।

এর অর্থ কি এই যে, অরবিস তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে চাইছে? একটা পাগলও বুঝতে পারবে, অরবিস এটা বোঝাতে চায়নি। তারা পৃথিবী থেকে অন্ধত্ব দূর করার জন্য একটি প্রতিজ্ঞাকে এভাবে প্রকাশ করেছে মাত্র। এবং আমি মনে করি, এটা খুবই বুদ্ধিদীপ্ত কমিউনিকেশন। এ ধরনের একটি বিজ্ঞাপন কোথাও প্রকাশিত হলে, অনেকেই অনেক সময় ধরে বিজ্ঞাপনটির দিকে তাকিয়ে থাকবেন এবং এটা নিয়ে কথা বলবেন। এটাই হয়তো অরবিসের সাফল্য। যে কারণে আমি আজও ওই বিজ্ঞাপনটি নিয়ে কথা বলছি।

আমি লিখতে গিয়েছিলাম, ‘অরবিস আরো বড় হও’। পরমুহুর্তেই খটকা লাগলো। নতুন করে লিখলাম, ‘অরবিস তুমি দ্রুত ছোট হও, এই পৃথিবী থেকে অন্ধত্ব দূর হোক।’

 

তিন.

বাংলাদেশে অসংখ্য এনজিও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাদের একটি বড় অংশ কাজ করে দারিদ্রতা নিয়ে। তাদের মধ্যে ব্র্যাকও আছে। তবে ব্র্যাকের বর্তমান কার্যক্রম শুধুমাত্র দারিদ্র বিমোচন নয়, তারা তাদের কার্যক্রমকে ক্ষুদ্রঋণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, আইনসহায়তা, সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ, জীবিকা সংস্থান, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণসহ অসংখ্য কাজে ছড়িয়ে গেছে। তবে মূল উদ্দেশ্য হল, সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন পরিচালনা করা।

এটা কি একটি খারাপ কাজ? অবশ্যই নয়। এই পৃথিবীতে সম্পদের সুষম বন্টন হয়নি। যে বৃটিশরা আমাদের দু’শ বছরেরও বেশি শোষণ করে আমাদের সম্পদ নিয়ে গেছে, এখন তাদের কাছ থেকেই আমাদের সাহায্য নিতে হয়, গণতন্ত্র শিখতে হয়; কিংবা মানুষের অধিকার কিভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় – তার বয়ান শুনতে হয়। এটাই হয়তো পৃথিবীর বড় প্রহসন। আলেক্জান্ডারের গুরু ছিলেন এরিস্টটল। সেই এরিস্টটলের ছাত্র আলেক্জান্ডারকে কেন মানুষ ‘দি গ্রেট’ বলে আমি জানি না। আলেক্জান্ডারের হাতে এতো রক্তের দাগ, তারপরেও তার নামের পরে ‘দি গ্রেট’। একটি মানুষের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে যুদ্ধ, তাকে আমাদের গ্রেট বলতে হবে!

এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এখনও অভুক্ত থাকে; এই গ্রহে টয়লেটের চেয়ে মোবাইল ফোনের সংখ্যা অনেক বেশি। মানুষ বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারে না। কিন্তু আমরা সবাই একই আকাশের নীচে থাকি এবং একই অক্সিজেন দিয়ে জীবন বাঁচাই। এই গ্যাপ যারা কমিয়ে আনার জন্য কাজ করছেন, তাদের চেয়ে মহৎ আর কিছু হতে পারে না। অ-উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সমস্যা প্রকট। আর তাই এই সকল এলাকাতে সরকারের পাশাপাশি এনজিও-গুলোকে কাজ করতে হয়। যেমন, এক সময়কার সুন্দর আফগানিস্তানে এখন এনজিও কর্মকাণ্ড দিয়ে মানুষের জীবনকে কিছুটা বাঁচিয়ে রাখা গেছে। সরকারের একার পক্ষে এতো কিছু করা সম্ভব হয়ে ওঠছে না।

একই কারণে বাংলাদেশে অসংখ্য এনজিও জন্ম নিয়েছে। কোনো কোনো এনজিও-র কর্মকান্ড নিয়ে হয়তো সমালোচনা হতে পারে, তবে দারিদ্রসীমার নীচে আছি বলেই, শিক্ষায় পিছিয়ে আছি বলেই, আমরা সামাজিকভাবে সুগঠিত নই বলেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। এবং অনেক প্রতিষ্ঠান নিঃসন্দেহভাবে ভালো কাজ করছে।

ব্র্যাক নিয়ে আমার মন্তব্য ছিল, অরবিসের ভিশনের মতো। যারা ব্র্যাক তৈরীর পেছনে ছিলেন এবং এখনও যুক্ত রয়েছেন – তাদের ভিশন নিশ্চয়ই এমনটাই যে, এই দেশ থেকে দারিদ্রকে দূর করবেন, শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করবেন। তখনই তাদের সাফল্য পরিমাপযোগ্য হবে। যখন পুরোপুরি তারা এ কাজে সফল হবেন, আমরা একটি উন্নত দেশে পরিণত হব। আমরা হয়ে যাব মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর, নয়তো বৃটেন। তখন এই কাজগুলো করার জন্য ব্র্যাকের প্রয়োজন হবে না। তারা ভিন্ন দেশে গিয়ে তাদের সমস্যাগুলোকে সমাধান করবে। এবং আমাদের তখন হয়তো নতুন সমস্যা তৈরী হবে – সেগুলোকে এড্রেস করবে। আমি তো মনে করি, যেদিন ব্র্যাক ম্যানেজমেন্ট সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারবে, এ বছর তাদের ক্ষুদ্রঋণের  পরিমান ৯০ শতাংশ কমে গেছে, তাহলেই তো সেটা সাফল্য। নইলে, ব্র্যাক তাদের সাফল্য পরিমান করে কিভাবে? তারা কি এটা বলে যে, এ বছর আরো ৯০ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে চলে গেছে? এটা নিশ্চয়ই তাদের সাফল্য নয়!

একই বিষয়টি গ্রামীণ ব্যাংকের বেলাতেও প্রযোজ্য। অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনূস যখন বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে দারিদ্রকে মিউজিয়ামে পাঠাবেন, তখন তার ওই বক্তব্যের মধ্যেই কি নিহিত থাকে না যে, ২০২০ সালের পর আর মানুষকে ক্ষুদ্রঋণ নিতে হবে না? তারা মধ্যম আয়ের মানুষ হয়ে যাবেন এবং প্রথগত মূল ব্যাংকিংয়ের আওতায় চলে আসবেন। গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম যদি শত শত বছর ধরে পরিচালিত হয়, তাহলে তারা তাদের সাফল্যকে কিভাবে পরিমাপ করবেন? এই কার্যক্রম তো সীমাহীন সময় ধরে চলতে পারে না। তাহলে তো আর তারা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারলেন না।

এই সহজ বিষয়টি না বুঝলে তাদের মনের অন্ধত্ব দূর করার জন্য আরেকটি অরবিসের প্রয়োজন হতে পারে।

 

চার.

দীর্ঘ ২২ দিন বন্ধ থাকার পর, গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে ফেসবুকের এক্সেস খুলে দেওয়া হয়েছে। আমি জানি অনেকেই বিশ্বাস করবেন না যে, আমি এই ২২দিন ভিপিএন ব্যবহার করিনি, ফেসবুক ব্যবহার করিনি। এমনকি এটা নিয়ে কোথাও কথাও বলিনি, কোনো লেখাও লিখিনি।

গতকাল ফেসবুক খুলে দেওয়ার পর একাত্তর টিভি থেকে আমাকে একটি আলোচনায় অংশ নিতে অনুরোধ করা হয়। আমি মিডিয়া নিয়ে কাজ করার পরও টিভি এড়িয়ে চলি। ওখানে কথাগুলো সঠিকভাবে গুছিয়ে বলা যায় না। এতো মানুষ থাকে, কথাগুলো এলোমেলো হয়ে যায়। কিন্তু কাল তাদের অনুরোধ রাখলাম। আলোচনার এক পর্যায়ে মাননীয় মন্ত্রী তারানা হালিম টেলিফোনে অংশগ্রহণ করেন। তার গলার টোন থেকে মনে হয়েছে, তিনি পুরো পরিস্থিতিটি নিয়েই আপসেট। তাই এখানে একটু লেখার চেষ্টা করছি, এই সামাজিক মাধ্যমগুলো নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত।

ক). প্রথমেই বলি, আমি কেন গত ২২ দিন ভিপিএন ব্যবহার করে ফেসবুক ব্যবহার করিনি। গতকাল যখন আমি এটা টিভিতে বলি, উপস্থাপিকা সামিয়া রহমান হাসতে হাসতে বললেন, আপনি ভয় পেয়েছেন। এটা আসলে সাহস কিংবা ভয়ের বিষয় নয়। আমি যদি চাইতাম, তাহলে সরকার সেটা টের পেতো বলে আমি মনে করি না। তবে, আমি সরকারের একটি সিদ্ধান্তকে সন্মান জানিয়েছি কেবল। প্রযুক্তিগতভাবে আমি অনেক কিছুই করতে পারি। কিন্তু আমি পারি বলেই করব, তার তো কোনো অর্থ নেই। বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রী ভিন্ন পথে ফেসবুক ব্যবহার করলেও, আমি করিনি। আমি ফেসবুকে লগ-ইনও করিনি, কোনো ম্যাসেজও দেখিনি। অনেকেই ভাবতে পারেন, আমি হলাম এই সরকারের সবচে বড় চামচা। কিন্তু, আমার মতো একজন মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করছে কি করছে না, তাতে কার কী আসে যায়। আমার পয়েন্ট ভিন্ন। নিরাপত্তার কারণে যেহেতু সরকার একটি সিস্টেমকে ব্লক করেছে, আমি কেন সেই নিয়মকে বাই-পাস করব?  আজ যদি আমেরিকার সরকার একই কাজ করতো আমি কি সেটাকে ভঙ্গ করে ফেসবুক ব্যবহার করতাম? করতাম না। তাহলে বাংলাদেশের বেলায় সেটা হবে কেন? রাস্ট্রের সিদ্ধান্তকে আমি সন্মান জানিয়েছি। সেটা আমি যখন যেই রাষ্টে থাকব, তখন সেই রাষ্ট্রের নিয়ম মেনেই আমাকে চলতে হবে।

খ). ফেসবুক বন্ধের পেছনে সরকার কারণ দেখিয়েছে, নিরাপত্তা জনিত। এটা আমাদের সবাইকেই মানতে হবে যে, নিরাপত্তা সংক্রান্ত যে তথ্য সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে থাকে, তা আমাদের কাছে থাকে না। তাই আমরা যতোই চিৎকার করি, নিরাপত্তা কোনো ইস্যু নয় – সেটা শুধু এক ধরনের প্রতিবাদ হতে পারে। এটা মোটেও তথ্যনির্ভর হবে না। আর সরকার তো আমাদের সাথে সেই তথ্য শেয়ারও করছে না। পাশাপাশি আমরা কেউ নিরাপত্তা নিয়ে সরাসরি কাজও করি না। একটি দেশের সরকার যদি মনে করে, এতে তার জনগণের জীবন নিরাপদ হবে, সেই সরকার তো সেটা করতেই পারে। যদি সত্যি সত্যি তখন মানুষ মারা যেত, আমরাই কিন্তু উল্টো বলতাম, দেখো দেখো গোয়েন্দারা করে কী! এটা অবশ্যই ডাবল-এডজড সোর্ড। যারা এটা ম্যানেজ করছেন, তাদেরকে এই ধরনের পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাদের উপর প্রেসার বেশি – সেটা সবাই জানে। যেহেতু এই সময়ে তেমন কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটেনি, তাতে সরকার এবং তাদের সংস্থাগুলো সাধুবাদ পাবেন নিশ্চয়ই।

গ). মানুষের জীবন কতটা মূল্যবান, কেন ফেসবুক, ভাইবারসহ অন্যান্য সিস্টেম বন্ধ রাখতে হবে – সেগুলো ব্যাখ্যা করে মাননীয় মন্ত্রী তারানা হালিম একটি লেখা প্রকাশ করেছিলেন। কালকের টেলিফোনেও একই বাক্যগুলো তিনি খুব আবেগমিশ্রিত কণ্ঠে বলেছেন। এই পুরো পরিস্থিতির চাপটুকু তার উপর দিয়ে যাচ্ছে, সেটা বোঝা যাচ্ছিল। কিন্তু এই পুরো বিষয়টির জন্য একজন স্পোক-পার্সন থাকতে পারত। তিনিই হয়তো এই কঠিন বিষয়গুলো প্রফেশনালী হ্যান্ডেল করতে পারতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ক্রাইসিসের সময় স্পোক-পার্সন থাকেন। তাহলে একটি জায়গা থেকে তথ্যগুলো আসে এবং সমাজে কনফিউশন কম তৈরী হয়। আমরা যেহেতু সমাজ নিয়ে এতো ভাবি না, তাই হয়তো স্পোক-পার্সন নিয়োগ করার কথা ভাবিনা। মাননীয় মন্ত্রীদেরকেই সকল প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। ভবিষ্যতে এই বিষয়টি তারা মাথায় রাখতে পারেন।

ঘ). বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলে আমার যা মনে হয়েছে, তারা বিশ্বাস করে না যে ফেসবুক বন্ধ করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম রোধ করা যায়। প্রথমে যখন সাময়িকভাবে ফেসবুক বন্ধ করা হয়েছিল, তখন তারা এটাকে এপ্রিশিয়েট করেছিল। কিন্তু এই লম্বা সময় ধরে আটকে রেখে, সেই এপ্রিশিয়েশনকে আর ধরে রাখা যায়নি। মানুষ বিরক্ত হয়েছে; এবং তারা ধীরে ধীরে বিকল্প পথে ফেসবুক ব্যবহার করতে শুরু করেছে। শেষের দিকে এসে ব্যাপারটা এমনি হয়ে গিয়েছিল যে, চারপাশের সবাই ভিপিএন/প্রক্সি ব্যবহার করে ফেসবুক/ভাইবার ব্যবহার করতে শুরু করেন। তাহলে যেকারণে এটাকে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল, সেই উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে গেল। এবং পরবর্তীতে আর ফেসবুক বন্ধ করা যাবে না। মানুষ প্রথম দিনেই ভিপিএন ব্যবহার শুরু করে দেবে! মানুষ কেন সরকারের সিদ্ধান্তকে বিশ্বাস করছে না, এটা ভেবে দেখার প্রয়োজন থাকলেও, আমি নিশ্চিত এটা নিয়ে কেউ ভাবছে না। পাবলিককে কিভাবে ম্যানেজ করতে হয়, তার ফর্মুলা এই দেশে ভিন্ন। এগুলো নিয়ে কোনো কথা বলে কাজ হয় বলে আমি মনে করি না।

ঙ). পাশাপাশি, ফেসবুকের মতো একটি জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম লম্বা সময় ধরে বন্ধ থাকাতে সরকারেরই বেশি ক্ষতি হয়েছে। কারণ, এই পুরো সময়টাতে ফেসবুকে সরকারের উপস্থিতি নিশ্চয়ই কম ছিল। সরকার যদি উপস্থিত থাকত, তাহলে অনেক কিছুই সেখানে পোস্ট করতে পারত। ভবিষ্যতে এমন লম্বা সময় নিয়ে যেন এমন একটি প্ল্যাটফর্ম বন্ধ রাখতে না হয়, সেটা মাথায় রাখাটা জরুরি।

 

পাঁচ.

বাংলাদেশের মানুষ ফেসবুক নিয়ে যতোটা মাতোয়ারা, বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলোতেও কি তাই? আমার কাছে মনে হয়, বাংলাদেশের মানুষ ফেসবুকের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। এর একটি বড় কারণ হতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ ফেসবুককে এক ধরনের কাঠগড়া মনে করে থাকে। তারা সেখানেই বিচার-আচার সব করে ফেলেন। কার পেছনে কার লাগতে হবে, কাকে পঁচানো যাবে, কিংবা নিজের ভেতরে যে ক্ষোভ রয়েছে তা প্রকাশ করার একটি জায়গা যেন তারা পেয়েছেন। নইলে, একটি প্ল্যাটফর্মের জন্য মানুষ এমন মরিয়া হয়ে উঠবে কেন? নিশ্চই, তাদের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে ফেসবুকের বিশাল সফলতা। তাদের এই সফলতার কারণটি আমরা কি কেউ একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখেছি? পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতে টুইটার অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করলেও, বাংলাদেশে কিন্তু সেটা হয়ে ওঠেনি। এর মূল কারণটি আমাদের মনস্তাত্বিক কাঠামোর সাথে জড়িত। সাধারণ মানুষের নিত্যদিন কথা বলার জন্য কিছু টপিকের প্রয়োজন হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রসালো টপিক, গসিপ। ফেসবুক হলো আমাদের সবচে বড় গসিপের জায়গা। আমরা যদি গসিপের জন্য আরো কিছু প্ল্যাটফর্ম তৈরী করতে পারতাম, তাহলে ফেসবুকের উপর এই নির্ভরতা কমত। সরকার এই বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে।

 

১১ ডিসেম্বর ২০১৫
লেখক: তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সম্পাদক

About admin

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful